Post Image

রক্তনক্ষত্রের সাগর


মহাকাশের এক বিস্মৃত প্রান্তে ছিল এক মৃত গ্রহ—নাইরেক্স। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, গ্রহটা যেন বরফ আর ছাইয়ে ঢাকা। কিন্তু কাছে এলে বোঝা যেত, তার বুকে বইছে লাল, আঠালো এক সাগর—যেন হাজার বছরের জমে থাকা রক্ত।

কথিত ছিল, এই সাগর কোনো জল নয়। এটা ছিল সেইসব প্রাণের স্মৃতি, যারা একসময় এই গ্রহে বাস করত। তারা নক্ষত্রের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নিজেদেরই ধ্বংস ডেকে এনেছিল। শেষ বিস্ফোরণের রাতে আকাশ থেকে আগুন ঝরেছিল, আর তাদের দেহ গলে মিশে গিয়েছিল গ্রহের মাটিতে। তখন থেকেই নাইরেক্সের বুক থেকে মাঝেমধ্যে উঠে আসে লাল অগ্নিস্তম্ভ—যেন মৃতেরা এখনো আকাশে ফিরতে চায়।

একদিন পৃথিবী থেকে আসা এক অনুসন্ধানযান সেই গ্রহে নামে। দলে ছিল তরুণ বিজ্ঞানী আরিন। তার কাজ ছিল ওই লাল সাগরের উৎস খুঁজে বের করা। প্রথমে সবকিছু নিস্তব্ধ ছিল। শুধু দূরে দূরে কাঁপতে থাকা আগুনের ফুলকি আর সাগরের ঘূর্ণি।

কিন্তু রাত নামতেই সে শুনল—ফিসফিসানি।

“ফিরে যাও...”

আরিন ভেবেছিল, হয়তো হেলমেটের ভেতর যন্ত্রের গোলমাল। কিন্তু তারপর সে দেখল, লাল সাগরের ঢেউয়ের নিচে অস্পষ্ট কিছু মুখ। তারা যেন তাকিয়ে আছে—অভিযোগে, ক্ষুধায়, অভিশাপে। যতই সে এগোতে লাগল, ততই সাগর অস্থির হয়ে উঠল। একসময় সাগরের মাঝখানে এক বিশাল ঘূর্ণি খুলে গেল। তার কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে উঠল এক অন্ধকার অবয়ব, যার শরীর ছিল গলিত ছায়া আর আগুনে তৈরি।

ওটা বলল,
“আমরা মরিনি। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি।”

আরিন বুঝতে পারল, এই গ্রহে মৃত্যু শেষ নয়। এখানে স্মৃতিই জীবিত, আর যন্ত্রণাই শক্তি। সে পালাতে চাইলে মাটি নরম হয়ে গেল, যেন পুরো গ্রহ তাকে গিলে ফেলতে চাইছে। তখন তার যন্ত্রে শেষবারের মতো পৃথিবীতে সংকেত পাঠানো হলো—

“নাইরেক্সে জীবন নেই। কিন্তু এখানে যা আছে… তা জীবনের চেয়েও ভয়ংকর।”

পরদিন অনুসন্ধানযানটিকে পাওয়া গিয়েছিল খালি অবস্থায়। আর নাইরেক্সের আকাশে দেখা গিয়েছিল নতুন একটি লাল অগ্নিস্তম্ভ—আগের চেয়ে একটু উঁচু, একটু উজ্জ্বল।

কেউ কেউ বলে,
সেটা ছিল আরিনের আত্মা,
যে এখনো আকাশ ভেদ করে বাড়ি ফিরতে চাইছে।

Chapters

EiAmi.com