Post Image

বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ: চর্যাপদের ইতিহাস, আবিষ্কার ও বৈশিষ্ট্য | বিসিএস প্রস্তুতি


বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ (প্রাচীন যুগ) বলতে সাধারণত ৬৫০/৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বোঝানো হয়। এই যুগের একমাত্র ও প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন হলো **চর্যাপদ** বা **চর্যাগীতি**। এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেছে। চর্যাপদকে বাংলা, অসমিয়া ও ওড়িয়া সাহিত্যের সাধারণ উত্তরাধিকারও বলা হয়। বিসিএস পরীক্ষায় এই বিষয়টি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অংশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 
১. চর্যাপদ কী?
চর্যাপদ হলো বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের রচিত সাধনমূলক গান বা দোঁহার সংকলন। এর অন্য নাম **চর্যাচর্য্যবিনিশ্চয়** বা **চর্যাগীতিকোষ**। এগুলো মূলত তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের (বজ্রযান) গূঢ় সাধনতত্ত্ব প্রকাশ করে। বাহ্যিক অর্থে সাধারণ জীবনের উপমা (যেমন: নৌকা, মাছ ধরা) দিয়ে অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক সাধনার কথা বলা হয়েছে। এটি সন্ধ্যা ভাষা (দুর্বোধ্য, প্রতীকী ভাষা) ব্যবহার করায় সাধারণ পাঠকের জন্য কঠিন।
 
২. চর্যাপদের আবিষ্কার
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় **হরপ্রসাদ শাস্ত্রী** নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে তালপাতার পুঁথি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা” নামে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে প্রবোধচন্দ্র বাগচী তিব্বতি অনুবাদ থেকে আরও কিছু পদ উদ্ধার করেন।
 
৩. চর্যাপদের ভাষা
চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা (নব্য আর্য ভাষার পূর্বাঞ্চলীয় রূপ)। এতে মাগধী প্রাকৃত ও অপভ্রংশের প্রভাব স্পষ্ট। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রথম প্রমাণ করেন যে এটি বাংলা ভাষায় রচিত। ভাষায় তৎসম, তদ্ভব শব্দের মিশ্রণ রয়েছে। ধ্বনিতত্ত্বে প্রাচীন বাংলার বৈশিষ্ট্য (যেমন: সংস্কৃত ব্যঞ্জনের সরলীকরণ) দেখা যায়।
 
৪. চর্যাপদের ছন্দ
চর্যাপদ মূলত গেয় সংগীত। প্রত্যেক পদের শুরুতে রাগের নাম উল্লেখ আছে (যেমন: পটমঞ্জরী, গবুড়া, দেশাখ ইত্যাদি)। ছন্দ মূলত **পয়ার** বা **দোঁহা** ধরনের। এগুলো সুরসহ গাওয়ার জন্য রচিত, তাই লয়বদ্ধ ও সহজবোধ্য ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
আধুনিক ছন্দ বিশ্লেষণে চর্যাপদ মূলত মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত。এতে মূলত মাত্রা ও লয়ের ওপর ভিত্তি করে পয়ার ও ত্রিপদী রীতির মিশ্রণ দেখা যায়
চর্যাপদের ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
  • প্রধান ছন্দ: মাত্রাবৃত্ত。
  • মাত্রার হিসাব: চর্যাপদের ছন্দ প্রধানত ১৬ মাত্রার (৮+৮ মাত্রার চাল)। তবে কিছু পদে ১৪ বা ১৮ মাত্রারও দেখা মেলে।
  • গঠনশৈলী: এতে প্রাচীন বাংলার পয়ার (প্রতি চরণে ৮+৮ মোট ১৬ মাত্রা) ও ত্রিপদী (প্রতি চরণে ৮+৮+১০/১২ মাত্রা) ছন্দের ব্যবহার রয়েছে。
  • মুক্তক দল: চর্যাপদের ছন্দ প্রধানত দলবৃত্তীয় (Syllabic)। এখানে মুক্ত দল বা রুদ্ধ দল মিলিয়ে মাত্রার গণনা করা হয়। 
পাদটীকা: প্রাচীন যুগে ছন্দের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাকরণ বা নিয়ম না থাকলেও, চর্যাপদের গীতগুলো সুরের তালে তালে এই মাত্রাবৃত্ত ছন্দের নিয়ম মেনে রচিত হয়েছিল।
 
৫. চর্যাপদের পদ সংখ্যা
- মূল পুঁথিতে মোট **৫০/৫১টি** পদ ছিল (মতান্তরে)।
- বর্তমানে প্রাপ্ত/আবিষ্কৃত পদের সংখ্যা **সাড়ে ৪৬টি** (কিছু পদ খণ্ডিত বা নষ্ট)।
- ২৩, ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদ আংশিক বা সম্পূর্ণ নষ্ট।
 
৬. চর্যাপদের পদকর্তা
চর্যাপদের রচয়িতারা বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্য বা মহাসিদ্ধ। পদকর্তার সংখ্যা **২৩/২৪ জন** (মতান্তরে)। প্রত্যেক পদের শুরুতে পদকর্তার নাম (ভণিতা) থাকে, নামের শেষে ‘পা’ (পাদ) যুক্ত।
 
৭. কোন পদকর্তা কতগুলো পদ রচনা করেছেন
নিম্নে প্রধান পদকর্তাদের তালিকা (সাধারণত গৃহীত সংখ্যা):
 
- **কাহ্নপা** (কৃষ্ণাচার্য): **১১-১৩টি** (সর্বাধিক)
- **ভুসুকুপা** (শান্তিদেব): **৮টি**
- **লুইপা**: **২টি** (প্রথম পদের রচয়িতা)
- **কুক্কুরীপা**: **৩টি**
- অন্যান্য: ডোম্বীপা, শবরপা, সরহপা, দারিকপা, তান্তীপা ইত্যাদি।
 
 
চর্যাপদ শুধু সাহিত্য নয়, বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রামাণ্য দলিল। এর আবিষ্কার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে এক হাজার বছর পিছিয়ে দিয়েছে। বিসিএস প্রস্তুতির জন্য পদ সংখ্যা, আবিষ্কারক, প্রধান পদকর্তা ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্য মুখস্থ করুন। উদাহরণসহ লিখতে পারলে উচ্চ নম্বর পাওয়া সহজ।
 
**প্রস্তুতির টিপস**: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও সুকুমার সেনের গ্রন্থ পড়ুন। নিয়মিত MCQ অনুশীলন করুন।

Chapters

EiAmi.com