Post Image

অধ্যায় ১ | জীবের আবাসস্থল | প্রাথমিক বিজ্ঞান | বোর্ড বই সমাধান |PDF Download | Video Class


অধ্যায় ১
জীবের আবাসস্থল
 
উদ্ভিদ এবং প্রাণীসহ আরও অনেক বিচিত্র রকমের জীব নিয়ে জীবজগৎ গঠিত। জীবজগতে বিচিত্র ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। কোনো কোনো জীব স্থলভাগ বা মাটিতে বাস করে। কেউ আবার পানিতে বা মাটি ও পানি উভয় স্থানে বসবাস করে। কোনো কোনো জীবের প্রয়োজন ছায়াযুক্ত পরিবেশ, আবার কারো প্রয়োজন আলো আছে এমন পরিবেশ। এই অধ্যায়ে আমরা বিভিন্ন জীবের আবাসস্থল, বিভিন্ন আবাসস্থলে উদ্ভিদ ও প্রাণীর ধরন এবং পরিবেশে তাদের টিকে থাকার কৌশল ইত্যাদি সম্পর্কে জানব।
 
১. জীবের আবাসস্থল
 
যেখানে কোনো জীব স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে সেটাই
জীবের আবাসস্থল।
 
জীবের আবাসস্থলগুলো কী কী?
 
কাজ: উদ্ভিদ ও প্রাণী কোথায় জন্মে তা খুঁজে বের করা।
 
যা করতে হবে
 
১. বিদ্যালয় এবং নিজ বাড়ির আশপাশে যে সকল উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখেছি সেগুলোর নাম এবং এরা কোথায় জন্মেছে বা বাস করে তা নিচের ছকে লেখো।
উদ্ভিদের নাম    আবাসস্থল    প্রাণীর নাম    আবাসস্থল
আম স্থল মানুষ স্থল
কলা স্থল রুই মাছ পানি
কচুরিপানা পানি গরু স্থল
 
২. কয়েকজন সহপাঠীর সাথে ছকের তথ্য নিয়ে আলোচনা করি এবং জীবের আবাসস্থল সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করি।
 
সারসংক্ষেপ
 
বিভিন্ন জীব বিভিন্ন ধরনের আবাসস্থলে জন্মে ও বসবাস করে। জল বা স্থলভেদে যেমন বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ জন্মে, তেমনি বিভিন্ন ধরনের আবাসস্থলে ভিন্ন ভিন্ন রকমের প্রাণী বাস করে।
 
বিভিন্ন আবাসস্থলের বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্পর্কে আরও কিছু জানি
 
জীবের বসবাসের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ রয়েছে। যেমন— স্থলজ, জলজ, মেরু অঞ্চলের পরিবেশ। এসব পরিবেশে বসবাসরত প্রাণীদের মধ্যেও ভিন্নতা রয়েছে। পরিবেশের বিভিন্ন আবাসস্থলের যেমন ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তেমনি এখানে বসবাসকারী বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর মধ্যেও বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়।
 
স্থলজ আবাসস্থল
 
মাটি বা ভূমির পরিবেশ হলো স্থলজ আবাসস্থল। উদ্ভিদ ও প্রাণীর একটি বড়ো অংশ স্থলজ পরিবেশে বসবাস করে। স্থলভাগের উদ্ভিদ হলো আম, জাম, কাঁঠাল, নারিকেল, কলা, নিম, কড়ই, মেহগনি ইত্যাদি। এসব বড়ো বড়ো উদ্ভিদের নিচে ছায়াযুক্ত স্থান হলো ছোটো ছোটো উদ্ভিদের আবাস, যেমন— বিভিন্ন ধরনের ঘাস বা তৃণজাতীয় উদ্ভিদ। স্যাঁতস্যাঁতে, ভেজা ও ঠান্ডা স্থানে জন্মে মস ও ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ। কোনো কোনো উদ্ভিদ আবার বড়ো উদ্ভিদের গায়ে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকে, যেমন— অর্কিড ও বিভিন্ন ধরনের ফার্ন। আবার প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে মানুষ, গরু, ছাগল, হাতি, বাঘ, শেয়াল, হাঁস, মুরগি, বিভিন্ন রকমের পাখি, ইঁদুর, কেঁচো, পিঁপড়া ইত্যাদি। স্থলজ আবাসস্থলের মধ্যেও অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে, যেমন— বনজ, মরুজ, তৃণভূমি ইত্যাদি।
 
বনজ আবাসস্থল: যখন কোনো স্থানে প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ প্রচুর পরিমাণে জন্মায় তখন সেখানে বনের সৃষ্টি হয়। যেমন— আমাদের দেশের শালবন, সুন্দরবন। বনের উদ্ভিদসমূহের মধ্যে শাল বা গজারি, মেহগনি, সুন্দরী, গেওয়া, গর্জন অন্যতম। এছাড়াও আছে গুল্ম, তৃণ, মস ও ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ। বনজ পরিবেশে অনেক প্রাণীও বসবাস করে। যেমন— আমাদের সুন্দরবনে
 
বাঘ, হরিণ, বানর, কুমির ও বিভিন্ন ধরনের পাখির আবাসস্থল। ব্যাঙ উভচর প্রাণী, শিশু অবস্থায় (ব্যাঙাচি) এরা পানিতে থাকে। বড়ো হয়ে মাটি ও পানি উভয় স্থানে বসবাস করে। সাপ, ইঁদুর, কাঁকড়া মাটির গর্তে বাস করে। আমাদের দেশে হাতির আবাসস্থল হলো চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমি। আমাদের জাতীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুধু সুন্দরবনেই বাস করে।
 
তৃণভূমি: স্থলজ পরিবেশের মধ্যে অনেক স্থানে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের প্রাধান্য থাকে। এই ধরনের আবাসকে বলে তৃণভূমি। এখানে থাকে শণ, নলখাগড়া, বীরুৎ ও গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। প্রাণীদের মধ্যে থাকে হরিণ, কুকুর, খরগোশ, শেয়াল, বাজপাখি, পেঁচা, হায়েনা ইত্যাদি।
 
মরুজ আবাসস্থল: মরুভূমি হলো স্থলজ আবাসস্থলের মধ্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অঞ্চল। উচ্চ তাপমাত্রা, কম বৃষ্টিপাত, দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যাপক পার্থক্য এবং শুষ্ক আবহাওয়া মরুজ আবাসস্থলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। খেজুর, ফণীমনসাসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যাকটাস ও গুল্ম এই অঞ্চলের উদ্ভিদ। মরুজ আবাসস্থলের প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে উট, গিরগিটি, টিকটিকি, সাপ ও বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ।
 
মেরু আবাসস্থল: পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চল বরফে ঢাকা থাকে, যেমন- মেরু অঞ্চল। এ অঞ্চলে খুবই কম উদ্ভিদ জন্মে, এদের মধ্যে আছে আর্কটিক উইলো, কটন গ্রাস ও লাইকেন জাতীয় উদ্ভিদ। কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের প্রাণী এ অঞ্চলে বাস করে বাস করে। যেমন- শ্বেত ভল্লুক, সিল, পেঙ্গুইন ইত্যাদি।
 
জলজ আবাসস্থল
সারা বছর পানি থাকে এমন আবাসস্থলগুলোই জলজ আবাসস্থল। সমুদ্র, নদী, পুকুর, খাল, বিল, ইত্যাদি হলো জলজ আবাসস্থল। এসব আবাসস্থলের পরিবেশেরও ভিন্নতা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো স্বাদু পানির জলজ পরিবেশ। যেমন- নদী, পুকুর, খাল, বিল ইত্যাদি। এই পরিবেশে জন্মানো বিভিন্ন উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে শাপলা, পদ্ম, কচুরিপানা, ক্ষুদিপানা, টোপাপানা ও বিভিন্ন ধরনের শৈবাল।
 
প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙাসসহ অনেক ধরনের মাছ, কুমির, কাছিম, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি ইত্যাদি।
 
সামুদ্রিক আবাসস্থল: জলজ পরিবেশ হলেও সমুদ্রের পানি নদী, পুকুর, খাল, ও বিলের পানি থেকে আলাদা। সমুদ্রের পানি লবণাক্ত। এই পানিতে যে সকল উদ্ভিদ ও প্রাণী বাস করে তারা সাধারণত নদী, পুকুর বা খাল বিলে বসবাসকারী উদ্ভিদ ও প্রাণীদের থেকে আলাদা। সামুদ্রিক পরিবেশে প্রধান উদ্ভিদ হলো বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল, যেমন- ল্যামিনারিয়া (Laminaria), সারগাসাম
 
(Sargassam)। এছাড়াও সামুদ্রিক ঘাস-এর মধ্যে রয়েছে যস্টেরা (Zostera), হ্যালোডিউল (Halodule) ইত্যাদি। সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর মধ্যে রয়েছে তিমি, ডলফিন, অক্টোপাস, হাঙর, লাল কাঁকড়া, তারামাছ, জেলি ফিশসহ অসংখ্য প্রজাতির মাছ। সমুদ্রের লোনা পানির মাছের মধ্যে প্রধান হলো রূপচাঁদা, লইট্টা, লাক্ষা, কোরাল, স্যামন, টুনা, ইলিশ ইত্যাদি
 
জলাভূমি: কিছু কিছু নিচু এলাকা বছরের বেশির ভাগ সময় জলমগ্ন থাকে, বাকি সময় শুষ্ক থাকে। এদের বলে জলাভূমি। এসব এলাকায় ঋতু অনুযায়ী উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন হয়। বাংলাদেশের হাওড়, বাঁওড় এ ধরনের জলাভূমি। এ ধরনের জলাভূমি স্বাদু পানির হতে পারে। যেমন— রাতারগুল, হাকালুকি হাওড় এই ধরনের জলাভূমি। আবার লোনা পানির জলাভূমিও হতে পারে, যেমন— সুন্দরবন। পানির গভীরতার সাথে সাথে এখানে জীববৈচিত্রের পরিবর্তন হয়। এখানকার বিশেষ উদ্ভিদ হলো কলমি, হেলেঞ্চা, হিজল, করচ, বরুন ইত্যাদি। এ পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী যেমন— মাছ, সাপ, ব্যাঙ এবং জলচর পাখি দেখা যায়।
 
২. জীবের অভিযোজন
 
নির্দিষ্ট বাসস্থানের বা পরিবেশের সাথে জীবের খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকার প্রক্রিয়াকে অভিযোজন বলে। পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদের মধ্যে বিশেষ বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। প্রাণীদের মধ্যেও বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ গঠনগত নানারকম পরিবর্তন দেখা যায়।
 
বিভিন্ন পরিবেশে জীব কীভাবে নিজেকে খাপ খাওয়ায়?
 
কাজ: জীবের অভিযোজন কৌশল অনুসন্ধান
 
যা লাগবে:
 
১. কচুরিপানা
 
২. মুরগি ও হাঁসের পায়ের চিত্র
 
যা করতে হবে
 
১. কচুরিপানা এক ধরনের জলজ উদ্ভিদ। এরা পানিতে ভেসে থাকে। কচুরিপানা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করি।
 
২. আমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছি এদের কাণ্ডে প্রচুর পরিমাণে ফাঁপা অংশ থাকে। কচুরিপানায় এই ফাঁপা অংশ থাকার কারণ কী? কচুরিপানায় এই ফাঁপা অংশ থাকা-সম্পর্কিত ধারণা নিচের ফাঁকা জায়গায় লেখো।
"কচুরিপানার মধ্যে যে ফাঁপা অংশ থাকে তাকে বায়ুকুঠুরি বলে। এই বায়ুকুঠুরি কচুরিপানাকে জলজ পরিবেশে ভেসে থাকতে সাহায্য করে। এটি জলজ পরিবেশে উদ্ভিদের একটি অভিযোজন।"
জীবের আবাসস্থল
 
৩. বাস্তবে বা ছবিতে মুরগি এবং হাঁসের পায়ের আঙুলের মধ্যে ভিন্নতা পর্যবেক্ষণ করি। এ ভিন্নতার কারণ নিচের খালি জায়গায় লিখে রাখি।
মুরগির পাগুলো শক্ত, লম্বা এবং শক্ত নখরযুক্ত। এজন্য মুরগি মাটি খুঁড়ে পোকা বের করে খেতে পারে। অন্যদিকে হাঁসের পা-গুলো পাতার মতো পর্দাবিশিষ্ট। এতে হাঁস সহজে পানিতে সাঁতার কাটতে পারে।
৪. কয়েকটি দল গঠন করে উপরের কাজ দুটো নিয়ে আলোচনা করি।
 
৫. শ্রেণিতে দলের কাজ উপস্থাপন করি। উপস্থাপনের পর সহপাঠী ও শিক্ষকের মতামতের আলোকে কাজের সংশোধন প্রয়োজন হলে তা লিখে রাখি।
 
সারসংক্ষেপ
 
কচুরিপানার মধ্যে যে ফাঁপা অংশ থাকে তাকে বায়ুকুঠুরি বলে। এই বায়ুকুঠুরি কচুরিপানাকে জলজ পরিবেশে ভেসে থাকতে সাহায্য করে। বায়ুকুঠুরি জলজ পরিবেশে উদ্ভিদের একটি অভিযোজন। মুরগির
 
পা-গুলো শক্ত, লম্বা এবং শক্ত নখযুক্ত হয়। ফলে মুরগি মাটি খুঁড়ে পোকা বের করে খেতে পারে। হাঁসের পা-গুলো পাতার মতো পর্দাবিশিষ্ট। এতে হাঁস সহজে পানিতে সাঁতার কাটতে পারে।
 
জীবের অভিযোজন সম্পর্কে আরও কিছু জানি
 
কোনো জীব যে নির্দিষ্ট পরিবেশে বসবাস করে সেই পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিজের গঠন ও শরীরবৃত্তীয় কাজের পরিবর্তন ঘটায়। একে অভিযোজন বলে। মূলত বাসস্থান, আত্মরক্ষা, প্রজনন বা বংশবৃদ্ধির জন্য জীবে এসব পরিবর্তন ঘটে থাকে।
 
স্থলজ পরিবেশ
স্থলজ আবাসস্থলের মধ্যে প্রধান হলো বনজ পরিবেশ। এখানে প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ জন্মে। এদের কাণ্ড শক্ত ও মোটা এবং শাখা-প্রশাখা যুক্ত। এদের মূলও মোটা, শক্ত ও বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা যুক্ত। ফলে এরা কাণ্ডকে দৃঢ়ভাবে মাটির সাথে আটকে রাখতে পারে। শীতকালে বায়ু শুষ্ক থাকায় উদ্ভিদের পাতার মাধ্যমে পানি বের হয়ে যাওয়ার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এতে পানিশূন্য হয়ে উদ্ভিদের মৃত্যু হতে পারে। এরকম বিপদ হতে রক্ষা পেতে কোনো কোনো উদ্ভিদ শীতকালে পাতা ঝরিয়ে ফেলে।
 
বনজ পরিবেশের প্রাণীদের শ্বাসকার্য চালানোর জন্য শক্তিশালী ফুসফুস থাকে। দ্রুত ও দীর্ঘ পথ চলাচলের জন্য এদের পা অনেক শক্তিশালী হয়। শিকার ধরা ও মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য এদের তীক্ষ্ণ-ধারালো নখ ও দাঁত থাকে। বনজ পরিবেশের অন্যতম প্রাণী হলো পাখি। পাখিরা মূলত আকাশচারী। এদের ডানা আছে, হাড়ে মজ্জা কম থাকায় দেহ হালকা হয়। আবার দেহে বায়ুথলি থাকে, যা উড়তে সহায়তা করে। শিকারি পাখি যেমন ঈগলের শিকার ধরার জন্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি, ধারালো বড়শির মতো বাঁকানো ঠোঁট, নখযুক্ত পা এবং শক্তিশালী ডানা রয়েছে। বনের কিছু প্রাণী যেমন— গিরগিটি ও প্রজাপতি যে পরিবেশে বাস করে আত্মরক্ষার জন্য সেই পরিবেশের বর্ণ ধারণ করতে পারে।
 
মরুজ পরিবেশের কম বৃষ্টিপাত এবং উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে উদ্ভিদগুলো ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়ের মতো হয়। পানি জমা করে রাখার জন্য এসব গাছের পাতা ও কাণ্ড মোটা, চ্যাপ্টা এবং রসালো হয়। আত্মরক্ষার জন্য কোনো কোনো গাছের পাতা কাঁটায় রূপান্তরিত হয়। যেমন— বিভিন্ন ধরনের ক্যাকটাস, খেজুর ইত্যাদি। মরুজ পরিবেশের প্রাণীরা শরীরে পানি ও খাদ্য সঞ্চয় করে রাখতে পারে। যেমন— উট। সূর্যতাপ থেকে বাঁচার জন্য ছোটো ছোটো প্রাণীরা মাটির নিচে গর্ত করে বসবাস করে।
 
স্থলজ পরিবেশের মেরু অঞ্চল বরফে ঢাকা থাকে। এরূপ পরিবেশে খুবই কম উদ্ভিদ জন্মে। এরা তীব্র ঠান্ডা সহ্য করতে পারে। এখানে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের প্রাণী বাস করে। তীব্র ঠান্ডায় উষ্ণ থাকার জন্য এসব প্রাণীদের শরীরের চামড়ার নিচে পুরু চর্বির স্তর থাকে। এদের অধিকাংশই বরফের মতো সাদা লোমযুক্ত হওয়ায় সহজেই লুকিয়ে থেকে আত্মরক্ষা ও শিকার করতে পারে। এদের লম্বা, বাঁকানো এবং শক্তিশালী পা বরফে চলার জন্য অভিযোজিত হয়।
 
জলজ পরিবেশ
 
জলজ পরিবেশে পানির ঠেলার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য উদ্ভিদের দেহ নরম হয় ও মূল সংক্ষিপ্ত হয়। ভেসে থাকার জন্য প্রচুর বায়ু-কুঠুরি থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অঙ্গজ বংশবৃদ্ধি করে।
 
পানির ঠেলার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য মাছের দেহের মধ্যভাগ চ্যাপ্টা এবং মাথা ও লেজের দিকে সরু হয়। পানিতে ভেসে থাকা ও চলাচলের জন্য এদের দেহে বায়ুথলি বা পটকা থাকে। পাখনা ও লেজ এদের সাঁতার কাটতে সাহায্য করে। এরা ফুলকা দিয়ে পানিতে থাকা অক্সিজেন গ্রহণ করে শ্বাসকার্য চালায়।
 
প্রশ্ন: মাছ পানিতে কীভাবে অক্সিজেন নেয়?
 
উত্তর: মাছ ফুলকার সাহায্যে পানিতে থাকা অক্সিজেন নেয়।
 
জলজ পরিবেশের সবচেয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল হলো সামুদ্রিক পরিবেশ। এই পরিবেশে পানির লবণাক্ততা ও পানির প্রবল চাপ মোকাবেলার জন্য জীবের অভিযোজন ঘটে। বিভিন্ন ধরনের ভাসমান শৈবালই এই পরিবেশের প্রধান উদ্ভিদ। সামুদ্রিক মাছেরও মাথা ও লেজের দিকে সরু এবং মধ্যভাগ চওড়া হয়। পাখনা ও লেজ সাঁতার কাটতে সাহায্য করে। সামুদ্রিক মেরুদণ্ডী প্রাণীদের ফুসফুস দীর্ঘ সময় ধরে বাতাস জমা রাখে। শিকার ও আত্মরক্ষার জন্য এরা আলো, রং ও বিষাক্ত তরল ব্যবহার করতে পারে।
 
জলাভূমি পরিবেশের উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে স্থলজ ও জলজ উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। উদ্ভিদের পাতা পাতলা ও প্রশস্ত এবং মূল জলজ উদ্ভিদের চেয়ে শক্তিশালী। জলমগ্ন অবস্থায় শ্বাসকার্য চালানোর জন্য শ্বাসমূল (Pneumatophore) বের হয়। জলাভূমি যখন পানিতে পূর্ণ থাকে তখন সেখানে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর আধিক্য দেখা যায়। পানি কমে গেলে কিছু কিছু প্রাণী অল্প পানিতে বা কাদার মধ্যে লুকিয়ে থেকে আত্মরক্ষা করে।
 
প্রশ্ন: সুন্দরী গাছের মূলগুলো মাটির উপরে উঠে আসে কেন?
 
উত্তর: সুন্দরবনের মাটি লবণাক্ত ও ভেজা। এর ফলে এই বনের সুন্দরী গাছের মূলগুলো শ্বাসকার্য চালাতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে না। এজন্য কিছু শ্বাসমূল মাটির উপরে উঠে আসে। এদের শ্বাসমূল বলে। শ্বাসমূলে অনেক ছিদ্র থাকে, যার মাধ্যমে সুন্দরী গাছ বায়ু থেকে শ্বাসকার্য চালানোর জন্য অক্সিজেন শোষণ করতে পারে।
 
অনুশীলনী
 
১. সঠিক উত্তরে টিক চিহ্ন (√) দিই
 
ক) জলজ উদ্ভিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য কোনটি?
 
☐ পাতা পুরু     ☐ বায়ুকুঠুরি     ☐ ফুল     ☐ কাঁটাযুক্ত
 
খ) মাংসাশী প্রাণীর প্রধান বৈশিষ্ট্য কোনটি?
 
☐ দ্রুত গতি     ☐ বড়ো আকৃতি     ☐ তীক্ষ্ণ দাঁত     ☐ চর্বির স্তর
 
গ) শ্বাসমূল কোন উদ্ভিদে পাওয়া যায়?
 
☐ হিজল     ☐ সুন্দরী     ☐ পাকুড়     ☐ কচুরিপানা
 
২. শূন্যস্থান পূরণ
 
নিচের শব্দগুলো থেকে সঠিক শব্দ নিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করি
[বায়ুথলি, চর্বিস্তর, ফার্ন, বায়ুকুঠুরি, মাছ]
 
ক) জলজ উদ্ভিদকে পানিতে ভেসে থাকতে সাহায্য করে বায়ুকুঠুরি
 
খ) তীব্র ঠান্ডায় প্রাণীর দেহকে গরম রাখে চর্বিস্তর
 
গ) ছায়াযুক্ত স্থানের একটি উদ্ভিদ হলো ফার্ন
 
৩. সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন:
 
ক) জীবের আবাসস্থল বলতে কী বুঝায়?
উত্তর: জীবের আবাসস্থল বলতে বোঝায়—যে স্থানে কোনো জীব স্বচ্ছন্দে বাস করতে পারে, খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে, বৃদ্ধি পায় এবং বেঁচে থাকতে পারে, সেটাই ওই জীবের আবাসস্থল।

উদাহরণ: মাছের আবাসস্থল পানি, পাখির আবাসস্থল গাছ বা বন, আর মানুষের আবাসস্থল স্থলভাগ।

খ) স্বাদু পানির পরিবেশে কী ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদ থাকে?
উত্তর: স্বাদু পানির পরিবেশে নদী, পুকুর, খাল ও বিলে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী থাকে।

উদ্ভিদ: শাপলা, পদ্ম, কচুরিপানা, ক্ষুদিপানা, টোপাপানা ও বিভিন্ন ধরনের শৈবাল।

প্রাণী: রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙাসসহ বিভিন্ন মাছ, কুমির, কাছিম, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক ও চিংড়ি।

গ) জলজ প্রাণীতে কী ধরনের অভিযোজন ঘটে?
উত্তর: জলজ প্রাণীতে পানিতে বেঁচে থাকা ও চলাচলের জন্য বিশেষ ধরনের অভিযোজন ঘটে। যেমন—

মাছের দেহের মধ্যভাগ চ্যাপ্টা এবং মাথা ও লেজের দিক সরু হয়, ফলে তারা সহজে পানিতে চলাচল করতে পারে। পানিতে ভেসে থাকা ও চলার জন্য তাদের দেহে বায়ুথলি বা পটকা থাকে। পাখনা ও লেজ সাঁতার কাটতে সাহায্য করে। মাছ ফুলকার সাহায্যে পানিতে থাকা অক্সিজেন গ্রহণ করে শ্বাসকার্য চালায়।

৪. বর্ণনামূলক-উত্তর প্রশ্ন:
 
ক) স্থলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?
উত্তর: স্থলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈশিষ্ট্যগুলো—

স্থলজ উদ্ভিদ:

  1. মাটিতে জন্মে ও মাটি থেকে পানি-খাদ্য গ্রহণ করে।
  2. কাণ্ড সাধারণত শক্ত, মোটা ও শাখা-প্রশাখাযুক্ত হয়।
  3. মূল মাটির গভীরে ছড়িয়ে গাছকে শক্তভাবে ধরে রাখে।
  4. মরুভূমির উদ্ভিদের পাতা ও কাণ্ড রসালো হয় এবং অনেক সময় পাতা কাঁটায় পরিণত হয়।
  5. উদাহরণ: আম, জাম, কাঁঠাল, শাল, মেহগনি, ক্যাকটাস।

স্থলজ প্রাণী:

  1. স্থলে বাস করে এবং ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাস নেয়।
  2. চলাফেরার জন্য শক্তিশালী পা থাকে।
  3. শিকারি প্রাণীর তীক্ষ্ণ দাঁত ও ধারালো নখর থাকে।
  4. মরুভূমির প্রাণী শরীরে পানি ও খাদ্য জমা রাখতে পারে।
  5. মেরু অঞ্চলের প্রাণীর দেহে পুরু চর্বি ও লোম থাকে।
  6. উদাহরণ: মানুষ, গরু, ছাগল, বাঘ, হরিণ, উট, শ্বেত ভল্লুক।
খ) জলজ পরিবেশের উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করি।
উত্তর: জলজ পরিবেশের উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈশিষ্ট্যগুলো—

জলজ উদ্ভিদ:

  1. পানিতে জন্মে ও বেড়ে ওঠে।
  2. দেহ সাধারণত নরম হয়।
  3. মূল সংক্ষিপ্ত বা দুর্বল হয়।
  4. ভেসে থাকার জন্য দেহে বায়ুকুঠুরি থাকে।
  5. উদাহরণ: শাপলা, পদ্ম, কচুরিপানা, ক্ষুদিপানা, শৈবাল।

জলজ প্রাণী:

  1. পানিতে বাস করে।
  2. মাছের দেহ মাথা ও লেজের দিকে সরু এবং মাঝখানে চওড়া হয়।
  3. পাখনা ও লেজ সাঁতার কাটতে সাহায্য করে।
  4. মাছ ফুলকার সাহায্যে পানিতে থাকা অক্সিজেন গ্রহণ করে।
  5. উদাহরণ: রুই, কাতলা, পাঙাস, চিংড়ি, কাঁকড়া, কুমির।
গ) সামুদ্রিক পরিবেশের প্রাণীদের অভিযোজনের ক্ষেত্রগুলো কী কী? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করি।
উত্তর: সামুদ্রিক পরিবেশের প্রাণীদের অভিযোজনের ক্ষেত্রগুলো—
  1. লবণাক্ত পানির সাথে অভিযোজন:
    সমুদ্রের পানি লবণাক্ত। তাই সামুদ্রিক প্রাণীরা লবণাক্ত পানিতে বেঁচে থাকার উপযোগীভাবে অভিযোজিত।
    উদাহরণ: হাঙর, টুনা, স্যামন, কোরাল মাছ।
  2. পানির প্রবল চাপ সহ্য করা:
    সমুদ্রের গভীরে পানির চাপ বেশি থাকে। সামুদ্রিক প্রাণীরা এই চাপ সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে।
    উদাহরণ: তিমি, ডলফিন, অক্টোপাস।
  3. সাঁতার কাটার উপযোগী দেহ:
    সামুদ্রিক মাছের মাথা ও লেজের দিক সরু এবং মাঝের অংশ চওড়া হয়। এতে তারা সহজে পানিতে চলাচল করতে পারে।
    উদাহরণ: টুনা, ইলিশ, রূপচাঁদা।
  4. পাখনা ও লেজের ব্যবহার:
    পাখনা ও লেজ সামুদ্রিক প্রাণীদের সাঁতার কাটতে ও দিক পরিবর্তন করতে সাহায্য করে।
    উদাহরণ: মাছ, হাঙর, ডলফিন।
  5. দীর্ঘ সময় শ্বাস ধরে রাখা:
    কিছু সামুদ্রিক মেরুদণ্ডী প্রাণীর ফুসফুসে দীর্ঘ সময় বাতাস জমা রাখতে পারে।
    উদাহরণ: তিমি ও ডলফিন।
  6. শিকার ও আত্মরক্ষা:
    কিছু সামুদ্রিক প্রাণী শিকার ধরা ও আত্মরক্ষার জন্য আলো, রং বা বিষাক্ত তরল ব্যবহার করে।
    উদাহরণ: অক্টোপাস রং পরিবর্তন করে ও কালি ছেড়ে আত্মরক্ষা করে, জেলি ফিশ বিষাক্ত দংশন ব্যবহার করে। 
ভিডিও ক্লাস দেখতে এখানে ক্লিক করুন
পিডিএফ ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন
 
 

Chapters

EiAmi.com