মায়াপুরীর সোনার পাখি
অনেক অনেক দিন আগে, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে ছিল এক আশ্চর্য রাজ্য—মায়াপুরী। সেই রাজ্যে রাত হলেই আকাশে হাজার রঙের তারা নাচত, ফুলেরা গান গাইত, আর নদীর পানি রূপার মতো ঝিকমিক করত।
সেই রাজ্যের রাজা ছিলেন খুব দয়ালু। তাঁর একমাত্র মেয়ে রাজকুমারী অন্বেষা ছিল খুব সাহসী আর বুদ্ধিমতী। কিন্তু একদিন হঠাৎ মায়াপুরীর আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল। ফুলেরা গান গাওয়া বন্ধ করে দিল। নদীর জল কালো হয়ে গেল।
রাজপ্রাসাদের সবচেয়ে বৃদ্ধ জাদুকর বললেন,
“মহারাজ, মায়াপুরীর প্রাণ হলো সোনার পাখি। দুষ্ট জাদুকর অন্ধকারেশ তাকে বন্দি করেছে। সোনার পাখিকে ফিরিয়ে না আনলে মায়াপুরী চিরতরে অন্ধকারে ডুবে যাবে।”
রাজা খুব চিন্তিত হলেন। কিন্তু রাজকুমারী অন্বেষা বলল,
“আমি যাবো। আমি সোনার পাখিকে ফিরিয়ে আনব।”
সে তার সাদা ঘোড়া তুফানকে নিয়ে রওনা দিল। পথে সে পৌঁছাল ফিসফিসে বন-এ। সেখানে গাছেরা কথা বলে।
এক বিশাল বটগাছ বলল,
“রাজকুমারী, সামনে বিপদ। অন্ধকারেশের দুর্গে যেতে হলে তোমাকে তিনটি পরীক্ষা পার হতে হবে।”
প্রথম পরীক্ষা ছিল সত্যের আয়না। আয়নাটি জিজ্ঞেস করল,
“তোমার সবচেয়ে বড় ভয় কী?”
অন্বেষা বলল,
“ব্যর্থ হওয়া। কিন্তু ভয় পেলেও আমি চেষ্টা থামাব না।”
সঙ্গে সঙ্গে আয়নাটি সোনালি আলোয় জ্বলে উঠল। সে প্রথম পরীক্ষায় পাস করল।
দ্বিতীয় পরীক্ষা ছিল অগ্নি নদী পার হওয়া। তখন এক ছোট্ট নীল পাখি এসে বলল,
“তুমি একদিন আমাকে শিকারির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলে। আজ আমি তোমাকে সাহায্য করব।”
পাখিটি ডানা মেলে আগুনের ওপর বরফের সেতু তৈরি করল।
তৃতীয় পরীক্ষায় তাকে মুখোমুখি হতে হলো অন্ধকারেশের।
অন্ধকারেশ গর্জে উঠল,
“তুমি আমাকে হারাতে পারবে না!”
অন্বেষা তার তলোয়ার বের করল না। বরং বলল,
“অন্ধকারকে শক্তি দিয়ে নয়, আলো দিয়েই হারানো যায়।”
সে নিজের হৃদয়ের সাহস দিয়ে জাদুমন্ত্র উচ্চারণ করল। সঙ্গে সঙ্গে তার বুক থেকে উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
অন্ধকারেশ চোখ ঢেকে চিৎকার করে পালিয়ে গেল।
খাঁচা খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সোনার পাখি। তার ডানা ঝাপটাতেই পুরো আকাশ সোনালি আলোয় ভরে উঠল।
মুহূর্তেই মায়াপুরীতে ফিরে এলো আলো, ফুলেরা আবার গান গাইতে লাগল, নদী আবার ঝিকমিক করতে লাগল।
রাজা আনন্দে অন্বেষাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেদিন থেকে সবাই তাকে ডাকতে লাগল—
“আলোর রাজকুমারী।”
আর মায়াপুরীতে আজও পূর্ণিমার রাতে সোনার পাখির গান শোনা যায়।
শিক্ষা: সত্য, সাহস আর দয়া—এই তিন শক্তি সবচেয়ে বড় জাদু।